ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২, ১২ জৈষ্ঠ্য ১৪২৮, ২১ জ্বমাদিউল সানি ১৪৪৩

সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্সুরেন্সে গ্রাহক প্রতারণা



সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্সুরেন্সে গ্রাহক প্রতারণা

  • চার বছরেও শেষ হয়নি তিন মাস!
  • গ্রাহকদের সঙ্গে দিশেহারা মাঠকর্মীরাও
  • আগের চেক পাস না করেই নতুন চেক
  • গাইবান্ধা-রংপুরে বীমা দাবি ৬০ লাখ টাকা

দেশের বীমা খাতের অন্যতম কোম্পানি সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্সুরেন্স লিমিটেডের পলিসির মেয়াদ শেষেও বীমা দাবি বুঝে না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বহু গ্রাহক। তারা বিভিন্ন শাখা অফিসের কর্মকর্তাদের কাছে ধর্ণা দিচ্ছেন দিনের পর দিন। গ্রাহকদের এই চাপ সামলাতে না পেরে শাখা ব্যবস্থাপকসহ কর্মকর্তাদের অনেকেই অফিসে হাজির হচ্ছেন না। অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এসব ঘটনায় প্রান্তিক পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণসহ গ্রাহকদের আস্থা অর্জনের সঙ্কটে পড়েছে জনপ্রিয় অনেক বীমা কোম্পানি।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, রংপুরের শঠিবাড়ি এবং গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানির দুই হাজার গ্রাহক পড়েছেন চরম বিপাকে। চার বছর আগে পলিসির মেয়াদ শেষ হলেও আজও বীমা দাবির প্রায় ৬০ লাখ টাকা বুঝে পাননি তারা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চেক দেয়ার পর ২০২২ সালে এসেও টাকার জন্য শাখা অফিসগুলোতে ঘুরে ঘুরে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে গ্রাহকদের। যদিও আগের চেক পাস না করেই নতুন করে আবারো ২৫ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানির অতিরিক্তি ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুশান্ত প্রামানিক। 

সানফ্লাওয়ারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে: এস এম শাকিল আখতার, নির্বাহী পরিচালক (যুগ্মসচিব), বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।

পাঁচ দিনের মধ্যে (১০-১৫ জানুয়ারি) গ্রাহক হয়রানীর বিষয়টি সমাধান করা হবে: সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্সুরেন্সের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান

ভুক্তভোগী গ্রাহকরা বলছেন, কোম্পানি থেকে চেক দেয়া হলেও তাদের একাউন্টে কোনো টাকা নেই। বার বার চেক জমা দিলেও তা ফেরত আসছে। এতে একদিকে যেমন চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা, তেমনি চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন কোম্পানির কর্মকর্তারা। চাপ সামলাতে না পেয়ে তাই শাখা অফিসগুলোর ব্যবস্থাপকসহ একাধিক কর্মকর্তা নিজেদের আড়াল করে রেখেছেন। আবার লোকলজ্জার ভয়ে অনেক কর্মকর্তা নিজের জমাজমি বিক্রি করে হলেও গ্রাহকদের বীমা দাবির টাকা পরিশোধ করার চেষ্টা করছেন।

জানতে চাইলে রংপুর ও গাইবান্ধা জেলা নিয়ে গঠিত বিভাগীয় অফিসের জোনাল ম্যানেজার (জিএম) চন্দন কুমার রায় আনন্দবাজারকে বলেন, আমার আওতাধীন এলাকাটি অত্যন্ত দরিদ্র পীড়িত। তারা দিন এনে দিন খেতেই কষ্ট হয়। তারপরও আগামীর সুন্দর জীবনের বিষয় চিন্তা করে আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখে বীমা প্রিমিয়াম পরিশোধ করেছে। অথচ মেয়াদ শেষ হলেও তাদের অর্থ বুঝে পাচ্ছেন না। এ নিয়ে প্রধান কার্যালয়ে বার বার গিয়েও কোনো সমাধান পাইনি। দিচ্ছি, দিবো বলে বলে কাল ক্ষেপন করা হয়।

বিভাগীয় অফিসের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, সর্বশেষ ২০১৭ সালে গ্রাহকদের বড় একটা অংশকে তাদের নিজেদের খরচে প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে গেলে অফিস বাধ্য হয়ে চেক দেয়। সেই সঙ্গে তিন মাস পর চেকগুলো ব্যাংকে জমা দিয়ে টাকা বুঝে নেয়ার কথাও বলা হয়। তবে ২০২২ সালে এসেও চেকগুলো জমা দিয়ে টাকা পাননি গ্রাহকরা। ব্যাংকে চেক জমা দিলে একাউন্টে কোনো টাকা নেই বলে জানিয়ে দেয়া হয়। এ ব্যাপারে বার বার প্রধান কার্যালয়ে গিয়েও কোনো সমাধান পাননি বিভাগীয় কর্মকর্তারা। 

জানতে চাইলে অনেকটা অসহায়ভাবে বিভাগীয় অফিসের জোনাল ম্যানেজার (জিএম) চন্দন কুমার রায় বলেন, গ্রাহকরা মনে করছেন আমরাই তাদের টাকা আত্মসাৎ করেছি। তাদের কোনোভাবেই বুঝানো যাচ্ছে না যে অফিস থেকে তাদের টাকা দিচ্ছে না। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে চন্দন কুমার রায় কান্নজড়িত কণ্ঠে বলেন, গ্রাহকের চাপ সামলাতে না পেরে মান সম্মান হারিয়ে বছর চারেক আগে থেকে বউ-বাচ্চা রেখে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমার তো গ্রাহকদের এতো টাকা পরিশোধের ক্ষমতা নেই। তিনি জানান, বিষয়টি জানিয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে এখন অবধি সাত সাতটি অভিযোগ দিয়েছি। এরপরও কোনো সহযোগিতা পাইনি।

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ি এলাকার আনোয়ার হোসেন কাজ করছেন আবুল খায়ের গ্রুপের বিক্রিয় প্রতিনিধি (এসআর) হিসেবে। তিনি তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিগত ২০০৮ সালে মাসিক ২০০ টাকা ও বার্ষিক দুই হাজার ৮৮৩ টাকা প্রিমিয়ামে সানফ্লাওয়ার ইন্সুরেন্সে দুটি পলিসি করেছিলাম। তবে ২০১৮ সালে মেয়াদ শেষ হলেও পাওনা বুঝে পাচ্ছি না। কোম্পানির অনেক কর্মকর্তা এখন আমাদের চাপে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আমরা আর কাকে ধরবো?

সানফ্লাওয়ার ইন্সুরেন্সের পলাশবাড়ী শাখার ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম আনন্দবাজারকে বলেন, কোম্পানিতে আমি কমিশনভিত্তিক কাজ করি। পলিসি করে দিতে পারলে কমিশন পাই। তবে এসব কাজ করতে গিয়ে মান সম্মান সব হারিয়েছি। এলাকায় মুখ দেখাতে পারছি না। যেদিকে যাই গ্রাহকদের নানা কথা শুনতে হয়। প্রধান কার্যালয়ে জানিয়েও কোনো কাজ হয়নি। নিজেদের পকেট থেকে দিয়ে যে গ্রাহকের টাকা পরিশোধ করবো সে সামর্থ্য নেই। বীমা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিক অভিযোগ দিয়েও কোনো সমাধান পাইনি।

সানফ্লাওয়ারের গাইবান্ধা জেলার নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) কর্মকর্তা রুবেল হোসেন আনন্দবাজারকে বলেন- আমার এলাকায় ৩০ লাখ টাকার বীমাদাবী এখনও পরিশোধ করা হচ্ছে না। গ্রাহকদের নিয়ে প্রধান কার্যালয়ে গিয়েও কোনো সমাধান পাইনি। উল্টো সেখানে গিয়ে আরেক অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রধান কার্যালয় থেকে কয়েকজন গ্রাহককে চেক দিলেও একাউন্টে কোনো টাকা না থাকায় কেউ তা তুলতে পারেনি। ২০১৭ সালের চেকে ১৯২১ সালের শেষে এসেও টাকা তোলা সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে বীমা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে যে টাকা খরচ করে অভিযোগ দিতে গেছি তাও শেষ।

শেষ অবধি একের পর এক অভিযোগ শাখা অফিসগুলোতে জমা হতে থাকলে মাঠকর্মীদের ওপর ভুক্তভোগী গ্রাহকদের তীব্র ক্ষোভ সামাল দিতে অন্যরকম কৌশলের আশ্রয় নেয় কোম্পানিটি। ২০১৭ থেকে ১৮ সাল পর্যন্ত কিছু গ্রাহককে তারা বীমাদাবির চেক দিয়ে দেন। একই সঙ্গে তিন মাস পর চেক ভাঙানোর কথা বলে তাদের শান্ত করেন। তবে সেই চেক থেকে চার বছর পরেও টাকা পাননি গ্রাহকরা।  

এসব অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্সুরেন্সের অতিরিক্তি ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুশান্ত প্রামানিক দৈনিক আনন্দবাজারকে অনেকটা সুখবর দেয়ার মতো করে বলেন, আমরা রংপুরে অফিসিয়াল ভ্রমণ করেছি। সেখানে ২০২১ সালের নভেম্বরে পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়া গ্রাহকদের নতুন করে ২৫ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে আগের চেকের টাকা না দিয়ে নতুন করে চেক দেয়ার কারণ জানতে চাইলে সুশান্ত প্রামানিক কোনো মন্তব্য না করে বলেন, আমরা টাকা দেয়ার ব্যবস্থা করছি। ধীরে ধীরে অর্থ ফেরত দেয়া হবে। তিনি এ বিষয়ে জানতে হিসাব বিভাগে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তার পরামর্শ মোতাবেক হিসাব বিভাগে গেলে কেউ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

পরে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) থেকে সানফ্লাওয়ার ইন্সুরেন্সের নির্ধারিত তত্ত্বাবধায়ক রাশিদুল আহসান হাবিব আনন্দবাজারকে বলেন, সানফ্লাওয়ার ইন্সুরেন্স অন্যান্য কোম্পানির চেয়ে অনেক ভালো। তারা গ্রাহকের টাকা ঠিকমতো পরিশোধ করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটু সমস্যা হতেই পারে। তার এমন মন্তব্যের বিপরীতে আনন্দবাজারের প্রশ্ন ছিলো, তাহলে একটি জোনাল অফিসেই চার বছরে গ্রাহকদের ৬০ লাখ টাকা বীমা দাবি পরিশোধ না করার অভিযোগ কীভাবে উঠে এলো? এসময় তাকে একজন গ্রাহকের নাম ও পলিসি নম্বরযুক্ত অভিযোগের কপি দেখানো হলে তিনি কিছুটা বিচলিত হয়ে বলেন, আমরা তাদের নোটিশ দিয়েছি। এখনো জবাব আসেনি। তবে আগের নোটিশের জবাবে তারা গ্রাহকের টাকা পরিশোধ করার বিষয়টি জানিয়েছে। তবে নতুন করে কোনো অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান রাশিদুল আহসান হাবিব। 

জানতে চাইলে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নির্বাহী পরিচালক (যুগ্মসচিব) এস এম শাকিল আখতার আনন্দবাজারকে বলেন, বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য আলাদা করে কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া আছে। তবে কোম্পানির তুলনায় আমাদের জনশক্তি অনেক কম। যে কারণে সঙ্কটে পড়তে হচ্ছে। তবে কেউ অভিযোগ করলে, তা সমাধানের চেষ্টা করি। যদিও অতিরিক্ত কাজের চাপে অনেক ক্ষেত্রেই বেগ পেতে হয়। গ্রাহকদের অভিযোগ বিষয়ে এস এম শাকিল আখতার বলেন, সানফ্লাওয়ার ইন্সুরেন্সের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্সুরেন্সের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান বলেন, এসব বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। আপনার মাধ্যমেই জানতে পারলাম। গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধ না করা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। পুরোনো চেকের টাকা না দিয়ে কেন নতুন চেক দেয়া হলো এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাঁচ দিনের মধ্যে (১০-১৫ জানুয়ারি) গ্রাহক হয়রানীর বিষয়টি সমাধান করা হবে।


   আরও সংবাদ