ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২, ১২ জৈষ্ঠ্য ১৪২৮, ২১ জ্বমাদিউল সানি ১৪৪৩

স্টার্টআপে অপার সম্ভাবনা



স্টার্টআপে অপার সম্ভাবনা

বিনিয়োগ ৩৬০০ কোটি টাকা

প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সাথে এমন অনেক কিছুই সম্ভব হচ্ছে, যা কিছুদিন আগেও ছিল কল্পনা। মোবাইল অ্যাপেই এখন মিলছে বাসের টিকেট, রাইড শেয়ারিং, ঘর গৃহস্থালির বিভিন্ন সার্ভিস এমনকি অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতামতও। আর এসবই সম্ভব হয়েছে স্টার্টআপের কারণে। বাংলাদেশে স্টার্টআপ'র ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। প্রযুক্তি খাতে এটির সম্ভাবনা আরও বেশি। এ খাতের উদ্যোক্তারাও দেখছে সফলতার মুখ। গবেষণা সংস্থা লাইটক্যাসল পার্টনার্সের তথ্যানুযায়ী ২০১০ থেকে চলতি ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মিলিয়ে স্টার্টআপে বিনিয়োগ হয়েছে ৪২ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ৩ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ ৩০ কোটি ডলার বা ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ২০২১ সালে আইটি খাত থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা, আর ২০২৫ সালে ৪৩ হাজার কোটি টাকা রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার অন্যতম পন্থা হলো স্টার্টআপ। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এ খাত নিয়ে কাজ করছি। অ্যাক্সেলারেটর প্রোগ্রাম এবং স্টার্টআপ ফান্ডের মাধ্যমে দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে সহায়তা করা হচ্ছে। আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসায়ের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করা হয়েছে। আগামীতেও যাতে স্টার্টআপগুলো বেড়ে উঠতে পারে তার জন্য নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখা হবে বলেও জানান তিনি।

জানা যায়, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ার পর ২০১৬-১৭ সালে কমে। ২০১৮ সাল থেকে আবার বড় বিনিয়োগ আসছে। অবশ্য ২০২০ সালে খাতটিতে করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দেশে স্টার্টআপে সর্বোচ্চ ১৩ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে চলতি ২০২১ সালে, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২ কোটি ৬০ লাখ ডলারই এসেছে বিদেশ থেকে। দেশীয় বিনিয়োগ মাত্র ৪০ লাখ ডলার। বিনিয়োগ হয়েছে ৪৮টি স্টার্টআপে। দেশীয় স্টার্টআপে ২০১৩ সাল থেকে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে। এখন পর্যন্ত দেশের মোট ২০৬টি স্টার্টআপ বিদেশি বিনিয়োগ নেওয়ার বিষয়ে চুক্তি করেছে। এর মধ্যে ১০৬টি স্টার্টআপ বিনিয়োগ পেয়েছে। ২০১৭ সালে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় কাছাকাছি। সেই বছর ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগের বিপরীতে স্থানীয় বিনিয়োগ ছিল ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ। পরের বছর থেকে বিদেশি বিনিয়োগই বেশি হচ্ছে।

জানা গেছে, ‘স্টার্টআপ’ নিয়ে ব্যাপক কর্ম তৎপরতা শুরু করেছে সরকার। ইতোমধ্যে স্টার্টআপের আওতায় তথ্যপ্রযুক্তি খাত ভিত্তিক বিভিন্ন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করতে গত কয়েক বছরে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ রাখা হলেও শুরুতে উদ্যোক্তা সঙ্কট থাকায় টাকা বিতরণ করতে পারেনি। তবে অনেকেই এখন এগিয়ে এসে সফলতা পেয়েছেন। এ কারণে স্টার্টআপদের জন্য একটি নীতিমালা তৈরির পাশাপাশি পলিসিগত সহায়তা প্রদানে অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পৃথক কর্মসূচী গ্রহণ করেছে।
টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) এক হিসাব দেখা যাচ্ছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭ কোটি ছাড়িয়েছে। এদের ৯৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ গ্রাহক মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এছাড়া জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের গড় বয়স ২৫ এর কাছাকাছি। যারা এ ব্যবসায় ব্যাপক আগ্রহী। তাই প্রতিদিনই স্টার্টআপ জন্ম নিচ্ছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের স্টার্টআপগুলোকে যথাযথভাবে সাহায্য ও দিকনির্দেশনা দিলে তা বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের স্টার্টআপদের উদ্ভাবনী ধারণাকে ব্যবসায় রূপান্তরিত করে দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করা যেমন সম্ভব, তেমনি বেকারত্ব দূর করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে এখন স্টার্টআপের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। কিন্তু সরকার ব্যবসা-সহায়ক মানসিকতা প্রদর্শন ও বিনিয়োগ পদ্ধতি সহজ না করলে এবং মেধার জোগান না বাড়লে বেশি দূর এগোনো যাবে না। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ইজেনারেশন গ্রুপের চেয়ারম্যান শামীম আহসান বলেন, চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করার জন্য যেভাবে কাজ করছে আমাদের দেশ কিন্তু সেভাবে এখনো শুরু করতে পারেনি। যে কারণে স্টার্টআপ খুব বেশি এগিয়ে যেতে পারছে না। এছাড়াও স্টার্টআপদের পলিসিগত কারণে নানান সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্টার্টআপকে বাংলাদেশে টিকিয়ে রাখতে হলে ট্যাক্স অব্যাহতি, অনুদান, সহজ শর্তে ঋণ এবং ইক্যুইটি বিনিয়োগের মাধ্যমে একই ধরনের নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া জরুরি।

তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এসবিকে ফাউন্ডেশন ও এসবিকে টেক ভেঞ্চার’র চেয়ারম্যান সোনিয়া বশির কবির বলেন, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে স্টার্টআপ হচ্ছে এমন একটি সমস্যার সমাধান করা যা এর আগে কেউ করতে পারেনি। পৃথিবীতে বর্তমানে ৪০০ কোটি মানুষ আছে যারা সবকিছু মোবাইল দিয়ে করবে। সার্ভিস, ডেলিভারি এমনকি ব্যাংকিংও মোবাইল দিয়ে করবে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের চাহিদাকে মাথায় রেখে যদি আমাদের স্টার্টআপরা কাজ করেন তাহলে বিশাল একটা মার্কেট তৈরি হবে। সোনিয়া বশির বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমস্যা সমাধানে নতুন কিছু আবিস্কার করার মতো অবস্থান এখনো তৈরি হয়নি। যে কারণে অন্যান্য দেশগুলো স্টার্টআপে আমাদের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে অনেকগুলো সমস্যা রয়েছে যা সমাধান করতে হবে। আমি বর্তমান এবং সামনে যে জেনারেশন আসছে তাদের নিয়ে খুবই আশাবাদী। কারণ এ সমস্যার সমাধান যে ডিজিটাল সিস্টেমে হবে সেদিকেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে ই-ক্যাবের উদ্যোক্তা এবং স্টার্টআপ স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ইকবাল বাহার জাহিদ বলেন, নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণের সুবিধা দিয়ে অটোমেশন জরুরি। নবীন স্টার্টআপগুলোকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন প্লাটফর্ম বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। বিনিয়োগ পাওয়া, মেন্টরিংরা পরামর্শ দিয়ে এ ধরনের প্লাটফর্মগুলো নতুনদের যথাযথ অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করছে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘স্টার্টআপ’ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। বর্তমানে দেশে ২ হাজার ৫০০ টির বেশি স্টার্টআপ কাজ করছে। ৪০টিরও বেশি এক্সেলেরেটর এবং ইনকিউবেটর প্রোগ্রাম তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু স্টার্টআপ দেশে প্রচুর বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে যা দেশের জন্য গর্বের বিষয়। অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি বাজেটে স্টার্টআপদের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই টাকা বিতরণে একটি নীতিমালা করছে সরকার। শীঘ্রই নীতিমালার আওতায় যোগ্য উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে আইসিটি বিভাগ। ইতোমধ্যে ৫০টিরও বেশি কোম্পানিকে ফান্ড দেয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে আইটি খাত থেকে ৪৩ হাজার কোটি টাকা রফতানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

স্টার্টআপে অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে আছে। যেমন গ্লোবাল স্টার্টআপ র‍্যাঙ্কিংয়ে ১০০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৩তম। তবে গত বছরের চেয়ে এবার পাঁচ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স বা উদ্ভাবন সূচকে ১৩২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১১৬তম স্থানে রয়েছে।


   আরও সংবাদ