Home / শিল্প-সাহিত্য / ‘মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ, মেনে নেবো এ আমার ঈদ’

‘মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ, মেনে নেবো এ আমার ঈদ’

ইমরান  নকীব: কবি আল মাহমুদের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। লোকান্তরিত হন ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে। আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। সাহিত্যের সব শাখায়ই তিনি উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেলেও কবি হিসেবেই পাঠক মহলে বেশি পরিচিত। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে।

পরে প্রকাশ পায় ‘কালের কলস’ ও ‘সোনালী কাবিন’। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ- মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, দোয়েল ও দয়িতা, দ্বিতীয় ভাঙন, বখতিয়ারের ঘোড়া ও তোমার রক্তে তোমার গন্ধেসহ আরও অনেক। তার প্রবন্ধে রয়েছে নতুন এক গদ্যশৈলী। লিখেছেন ‘পানকৌড়ির রক্ত’র মতো গল্পগ্রন্থ। সেই অমর হাত দিয়ে বেরিয়ে এসেছে ‘উপমহাদেশ’ ও ‘কাবিলের বোন’-এর মতো উপন্যাস।‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ ঘরানার ক্লাসিক জীবনীগ্রন্থ বিশ্বসাহিত্যেও বিরল। এ যাবৎ প্রকাশিত শতাধিক গ্রন্থ নিয়ে খ্যাতনামা প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিত হয়েছে আল মাহমুদের ১৩ খণ্ডের রচনাবলি।

বৈচিত্র‍্যময় তাঁর জীবন। কখনো সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন, কখনো প্রুফ রিডার ছিলেন, কখনো কবিতা লিখে গেছেন নিরন্তর। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন, স্বাধীনতার পর আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে জেল খেটেছেন, এরপর নিয়োগ পেয়েছেন শিল্পকলা একাডেমিতে। এক জীবনের বহু জীবনের স্বাদ নিতে পেরেছেন কবি।

মাত্র ১৮ বছর বয়স ১৯৫৪ সালে সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে কবি ঢাকা আসেন। তখন থেকেই তাঁর কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে। আজীবন আত্মপ্রত্যয়ী কবি ঢাকায় আসার পর কাব্য সাধনা করে একের পর এক সাফল্য লাভ করতে থাকেন। কবি নিজেই বর্ণনা করেছেন সে অভিজ্ঞতা। দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত ইমরান মাহফুজ’র নেয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রাম থেকে শহরে আসা নিয়ে কবি বলেন- “আমি ঢাকায় এসেছিলাম খদ্দরের পিরহান গায়ে, পরনে খদ্দরের পায়জামা, পায়ে রাবারের স্যান্ডেল, বগলের নিচে গোলাপফুল আঁকা ভাঙা সুটকেস নিয়ে। এসেছিলাম অবশ্যই কবি হতে।

আজ অনেক বছর শহরে আছি। আমার সুটকেসের ভেতর আমি নিয়ে এসেছিলাম বাংলাদেশের সবগুলো নদী, পাখি, পতঙ্গ, নৌকা, নর-নারীসহ বহমান আস্ত এক বাংলাদেশ। যেমন, জাদুকররা তাঁদের দ্রষ্টব্য দেখান। আমার ভাঙা সুটকেস থেকে জাতিকে দেখিয়েছি। আমার দ্রষ্টব্য দেখে বাংলার মানুষ কখনো কখনো হাততালি দিয়েছেন, আবার কখনো অশ্রুসিক্ত হয়েছেন। আমি এখনো এই শহরেই আছি। আমি যখন এসেছিলাম তখন আমার বন্ধুদের বগলের নিচে থাকতো সিলেক্টেড পয়েমস জাতীয় ইউরোপের নানা ভাষার নানা কাব্যগ্রন্থ। আমি যেমন আমার ভাঙা সুটকেস থেকে আমার জিনিস বের করে দেখিয়েছি তারাও তাঁদের বগলের নিচের পুঁজি থেকে নানা ভেলকি দেখিয়েছেন। এখনো আমি এই শহরেই আছি। আমার সেসব বন্ধুদের সৌভাগ্য হয়নি। এই মহানগরীতে তাঁদের নাম তরুণরা উচ্চারণ করেন না।”

কবি হওয়ার আজন্ম লালিত স্বপ্ন পূরণ করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি ছন্দ-অন্ত্যমিলের এই রাজাকে। সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ পত্রিকা এবং কলকাতার ‘নতুন সাহিত্য’, ‘চতুষ্কোণ’; বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তাঁর নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে; তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী ‘কাফেলা’ পত্রিকার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।

১৯৬৩ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘লোক-লোকান্তর’ সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর ‘কালের কলস’, ‘সোনালি কাবিন’, ‘মায়াবী পর্দা দুলে উঠো’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থগুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, যুদ্ধের পরে ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। মূলত এই সময় তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এক বছরের জন্য একবার জেল খাটেন। পরে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু তাকে শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে নিয়োগ দেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি পরিচালক হন। পরিচালক হিসেবে ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

আধুনিক বাংলা কবিতায় আল মাহমুদ অনন্য এক জগৎ তৈরি করেন। সেই জগৎ যন্ত্রণাদগ্ধ শহরজীবন নিয়ে নয় – স্নিগ্ধ-শ্যামল, প্রশান্ত গ্রামীণ জীবন নিয়ে। গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতির চিরায়ত রূপ নিজস্ব কাব্যভাষা ও সংগঠনে শিল্পিত করে তোলেন কবি আল মাহমুদ।

তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদী নির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তার কবিতায় অবলম্বন করেন। নারী ও প্রেমের বিষয়টি তার কবিতায় ব্যাপকভাবে এসেছে। বলা যায়, আল মাহমুদ ছিলেন যৌবন ও প্রেমের কবি।

আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তার অনন্য কীর্তি।

কবি তাঁর কবিতায় যে মৌলিকত্ব, ক্ষমতা ও শক্তির সাথে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের লোকসত্ত্বাকে ধারন করেছেন, তা আর কোনো কবির পক্ষেই সম্ভব হয় নি। আধুনিক বাংলা সাহিত্য কলকাত্তাইয়া বাংলা ভাষার ধার করে আনা ছাঁচ থেকে বেরিয়ে এসে নতুন পূর্ববঙ্গীয় যে চেহারা ধারণ করেছে, তার পেছনে আল মাহমুদের অবদান তুলনারহিত। পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট লেখক, সমালোচক শিবনারায়ণ রায় বলেছিলেন, “বাংলা কবিতায় নতুন সম্ভাবনা এনেছেন আল মাহমুদ, পশ্চিম বাংলার কবিরা যা পারেনি তিনি সেই অসাধ্য সাধন করেছেন।”

বাংলা কবিতার রাজধানীকে কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করার কৃতিত্ব এককভাবে যদি আল মাহমুদকে দেয়া হয়, তাতে কোনো ভুল হবে না।কবি আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যে যে অবদান রেখে গেছেন, তাকে একটিমাত্র লেখায় বর্ণনা করা একেবারেই অসম্ভব। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের জাতীয় আত্মপরিচয় গড়ে তোলার একেবারে নেপথ্যের কয়েকজন মানুষের কথা যদি বলতে হয়, তবে তাদের ভেতর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আল মাহমুদের নাম রাখতেই হবে। হুমায়ূন আহমেদ যদি আধুনিক বাংলা গদ্যসাহিত্যের রাজা হয়ে থাকেন, তবে আল মাহমুদ নিঃসন্দেহে কবিতার জগতে একচ্ছত্র সম্রাট। তারপরেও এই কবি যেন কিছুটা অবহেলিত! কবির প্রাপ্য সম্মানের অনেকটাই হয়তো তিনি পান নি; অন্তত – কবির ধারণা এমনই।

তাঁর প্রবন্ধ সংকলন ‘সাহসের সমাচার’ গ্রন্থে তিনি বারবার এই কথাটাই বলেছেন।সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা – স্বাধীনতা পদক তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। তবে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন কবি।

অবশেষে সময় শেষ হয়ে এলো । অনেক দিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন কবি। দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়েছে প্রায় এক দশক হতে চলেছিলো। জীবন প্রদীপের যেটুকু আলো নিভু নিভু করে জ্বলছিলো, সেটিও দপ করে নিভে গেল এক  শুক্রবার রাতে। হাজারো ভক্তকে কাঁদিয়ে  মহান রবের কাছে চলে গেলেন এই মহান কবি।

About Imran

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Powered by Dragonballsuper Youtube Download animeshow