Home / এক্সক্লুসিভ / লকডাউনের অন্তরালে মানবতার হাহাকার!

লকডাউনের অন্তরালে মানবতার হাহাকার!

নাঈম কামাল: লকডাউন শুধু একটি শব্দ কিংবা একটি নাম নয়, এটি তৈরি করে হাজারো ইতিহাস। যে ইতিহাসের সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে হাহাকার, হতাশা আর মানবিক বিপর্যয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিপরীত দিকও লক্ষ্য করা যায়। যেখান থেকে আমাদের শেখার আছে অনেক কিছু কিন্তু আমরা শিক্ষা নিলাম কোথায়? প্রথম যখন করোনা সংক্রমণ শুরু হয়েছে, যখন আক্রান্ত হিসেবে শনাক্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে তখন মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে কিছুটা পরিবর্তন আসতে শুরু করেছিলো। কিছুদিন পর মানুষ যখন এই পরিস্থিতি মানিয়ে নিতে শুরু করলো তখন থেকেই আবার পূর্বের অবস্থানে ফিরে যেতে শুরু করেছে। বেড়েছে অন্যায়, অত্যাচার আর দূর্নীতি। করোনার টিকা ও মাস্ক নিয়েও তৈরি হয়েছে সিন্ডিকেট। যে যেভাবে পেরেছে অবৈধ পন্থায় টাকা কামিয়ে নিয়েছে। যাই হোক আমার আজকের বিষয় এটা না। আমি আজকে এমন একটা বিষয় নিয়ে লিখছি যা সত্যি অনেক কষ্টের, যে বিষয়টা আমার হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। হয়তো আপনাদের হৃদয়কেও নাড়া দিয়ে যাবে।

২০২০ সালের ২৬ মার্চ। সারাদেশে একযোগে শুরু হয় অঘোষিত লকডাউন। বন্ধ হয়ে যায় জরুরী জিনিসপত্রের দোকান ব্যাতিত সকল ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহন। একে একে বাড়তে থাকে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা তার সাথে পাল্লা দিয়ে দিয়ে বাড়তে থাকে প্রশাসনের কড়াকড়ি। কামাই-রুজি বন্ধ হয়ে যায় খেটে খাওয়া মানুষের। যতই দিন যাচ্ছে ততই বাড়তে শুরু করে তাদের হাহাকার। সবচেয়ে বেশি সমস্যা শুরু হয় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে। তারা না পারছে খেতে আর না পারছে কারো কাছে বলতে। সরকারের যত বরাদ্ধ সবগুলোই দরিদ্রদের জন্য। তাও আবার সঠিকভাবে পৌঁছায় না তাদের কাছে। সরকার বরাদ্ধ দেয় আর অধিকাংশ জনপ্রতিনিধিরা তাদের পকেট ভারি করে। তাদের পকেট ভারি করার পর যদি কিছু থাকে সেখান থেকে নামকাওয়াস্তে কিছু কিছু বরাদ্ধ পায় দরিদ্ররা। যদিও সব প্রতিনিধি এক না। এবার আসি মূল ঘটনায়।

আমি একটি সংবাদমাধ্যমের হেড অফিসে সহ-সম্পাদক হিসেব কাজ করার সুবাধে ঢাকায় অবস্থান করছিলাম। করোনার শুরু থেকেই ঢাকায়। যদিও করোনা শুরুর দিকেই আমাদের অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়। আমাদেরকে বাসা থেকে ডিউটি করার নির্দেশনা দেয়া হয় অফিস থেকে। নির্দেশনা পেয়ে অনেকেই ঢাকা ছাড়তে শুরু করে। কিন্তু আমার আর গ্রামের বাড়ি যাওয়া হয়নি। প্রায় জনশুন্য ঢাকায় থাকতে অনেকটা কষ্টই হয়েছিলো আমার। বাসা থেকে তেমন একটা বের হতাম না। কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে সবকিছুই বাসার সামনেই চলে আসতো। অনেকটা গৃহবন্ধীর মতোই দিন পার করেছি। তবে অভিজ্ঞতা হয়েছে প্রচুর।

আমি যে বাসায় থাকতাম তার পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন এক ভদ্রলোক ও তার পরিবার। তিনি পেশায় ছিলেন একজন ব্যাবসায়ী। আমাদের বাসার সামনের মার্কেটে তার একটা খাবার হোটেল ছিলো। মাঝেমধ্যে এই ভদ্রলোকের হোটেলে খিচুড়ি খেতে যেতাম। তার ব্যাবসা এবং সংসার ভালই চলছিলো। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে বেশ সুখেই ছিলেন তিনি। এরইমধ্যে হানা দেয় মহামারি করোনা। দেশে শুরু হয় লকডাউন। বন্ধ হয়ে যায় ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গণপরিবহন। বাধ যায়নি ভদ্রলোকের হোটেল। সময় কাটতে থাকে বাসায়। যতই লকডাউনের সময় বাড়তে থাকে ততই বাড়তে থাকে তার হতাশা। হতাশা ঘিরে ধরে পুরো পরিবারকে। এ যেন ‘নুন আনতে পান্তা পুরায়’ অবস্থা। আয়ের পথ পুরোটাই বন্ধ কিন্তু ব্যয়ের পথ পুরোটাই খোলা। বাসা ও হোটেল ভাড়া মিলিয়ে মাসে তার মোট ব্যয় প্রায় ৪৫ হাজার টাকা কিন্তু আয় একেবারেই শূন্য। লকডাউন যত বেড়েছে খাবারের জন্য তার সংসারে হাহাকার ততটাই তীব্র হয়েছে। যেহেতু তার হোটেল ব্যবসা ছিলো তার আর্থিক অবস্থা ভালো মনে করে কেউ সহায়তাও করতে আসেনি। লজ্জায় তারাও কারো কাছে চাইতেও পারেনি।

হঠাৎ একদিন সকাল বেলা সেই ভদ্রলোকের স্ত্রী আমাদের বসায় এসে হাজির। ত্রাণ কিংবা সহায়তার জন্য আসেনি, এসেছিলো আমাদের বাসায় কাজ খুঁজতে। তখন আমাদের বাসার খালা (যিনি রান্না কাজ করতেন) কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। আমার এখনও মনে পড়ে উনি যখন কাজ চাইতে এসেছিলেন তখনও লজ্জায় উনার মুখ লাল হয়ে গিয়েছিলো। বারবার এদিক-সেদিক তাকিয়ে কথা বলেছিলেন আমাদের সাথে। আমরাও রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। আগের খালার চেয়ে উনার বেতনও বেশি দিতে রাজি হয়েছিলাম। কথা শেষ করে উনি বাসায় চলে গেলেন। আগামীকাল থেকে রান্নার কাজ করে দিবেন আমাদেরকে। বিকেল বেলা অন্য একজনকে দিয়ে আমাদের বাসায় খবর পাঠালেন উনি আসতে পারবেন না। উনার ছেলে উনাকে কাজ করতে দিবেন না।

পরদিন যখন বাসা থেকে বের হয়ে হাটতে ছিলাম হঠাৎ রাস্তার একপাশে চোখ আটকে গেলো। তাকিয়ে দেখি সেই হোটেল মালিক এক ফ্লাক্স চা নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার কাছে গিয়ে এক কাপ চা অর্ডার করলাম। যদিও চা আমার তেমন পছন্দ না। আমি চা খুব কমই চা পান করি। চা শেষ করে বিল পরিশোধ করে বাসায় চলে আসলাম। আর ভাবতে লাগলাম যে লকডাউন মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য সে লকডাউন মানুষকে কতটা অসহায় করে তুলেছে। তারপর থেকে প্রতিদিন দুয়েকবার চা খেতে রাস্তায় বের হতাম। মনের মধ্যে একটাই চিন্তা এই লকডাউনে একটি পরিবারকে অন্তত সহায়তা করা হচ্ছে। আমার এক কাপ চা থেকে প্রাপ্ত মুনাফা হয়তো তার বাসায় এক মুঠো চাল নেয়ার অর্থ যোগাবে। সরাসরি অর্থ সহায়তায় হয় তো তিন লজ্জিত হবেন কিংবা নিবেন না সেই চিন্তা থেকেই ৫টাকার চা ১০ টাকায় কিনতাম। শুধু আমিই না আমার বাসার সবাই তার কাছ থেকে ১০ টাকা দিয়ে চা খেতাম।

আজকে হয়তো একজনের জীবনের গল্প তুলে ধরতে পেরেছি কিন্তু এরকম হাজারো মানুষের গল্প সমাজের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে রয়েছে। যাদের গল্প শোনার যেমন কেউ নেই তাদেরকে নিয়ে কিছু লেখার মানুষের তেমনই বড্ড অভাব।

উল্লেখ্য, এতকিছুর পরও আমাদের সাধ্য অনুযায়ী লকডাউন বাস্তবায়ণ করতে সরকারকে সহায়তা করা প্রয়োজন। বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের কিছুটা খতি হলেও আমাদেরকে মনে নেয়া উচিৎ যতটুকু সম্ভব।

লেখক: মোঃ নাঈম কামাল, বার্তা সম্পাদক: দেশ খবর.কম, সহ-সম্পাদক ‘বিবার্তা২৪ডটনেট’

About দেশ খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Powered by Dragonballsuper Youtube Download animeshow