ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ মাঘ ১৪২৯, ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

সীমান্তে  গোলাগুলিতে জনশূন্য বিশ গ্রাম, চারদিনে ৭ লাশ



সীমান্তে  গোলাগুলিতে জনশূন্য বিশ গ্রাম, চারদিনে ৭ লাশ

গুলি ও মর্টার শেলের গোলার বিকট শব্দ। ভয়ে-আতঙ্কে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে সীমান্ত এলাকা। জনশূন্য নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের ২০ গ্রাম। একই অবস্থা তুমব্রুবাজার এবং পার্শ্ববর্তী সীমান্ত অঞ্চলে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে টেকনাফের উখিয়া সীমান্ত এলাকায়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত গোলা বর্ষণের বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছিল। 

জানা গেছে, গত চার দিনে ৫ রোহিঙ্গা ও দুই মাদক কারবারী মিলে ৭টি লাশ পড়েছে সীমান্ত অঞ্চলে। দুইটি অজ্ঞাত লাশ ভেসে আসে নাফ নদীতে। ক্যাম্পে গোলাগুলি সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয় দুই রোহিঙ্গা। আর দুই মাদককারবারী র‍্যাবের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের তুমব্রু পশ্চিমকুল গ্রাম, কোনার পাড়া বাইশফাঁড়ি, ঘোনার পাড়া উখিয়ার বালু খালী, কাষ্টমস, আনজুনপাড়া, টেকনাফের হ্নীলা চৌধুরী পাড়া উনচিপ্রাং ও তুমব্রুসহ পার্শ্ববর্তী ২০ গ্রামের মানুষের চোখে ঘুম নেই। নেই নাওয়া খাওয়া।

এদিকে ঘুমধুম ও বালুখালীর দক্ষিণ পূর্বদিকে ৫০ থেকে ১০০ গজের মধ্যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের তুমব্রু রাইট ও ওয়ালিদং পাহাড়।সেখানে দেশটির বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) একাধিক  সীমান্তচৌকি।প্রত্যেক চৌকির নীচে রয়েছে ঘাঁটি। ঘাঁটির আশপাশ থেকে ছোড়া হচ্ছে মুহুর্মুহু গুলি। থেমে থেমে ছোড়া হচ্ছে আর্টিলারি, মর্টারের গোলা। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে দূরের (রাখাইন রাজ্য) পাহাড়ে। বিকট শব্দে কাঁপছে এপারের তুমব্রু পশ্চিমকুল, ক্যাম্পপাড়া, বাজারপাড়া, কোনারপাড়া, খিজারীঘোনা, ভূমিহীন পাড়া, উখিয়ার বালুখালী, কাষ্টমস পাড়া নলনুনিয়া,উলুবুনিয়া সহ অন্তত ২০ গ্রামের ঘরবাড়ি-ভূখণ্ড।

ঘুমধুম সীমান্তে এমন উত্তেজনার মধ্যেই সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং উচ্চবিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনে যান বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ইয়াসমিন পারভীন তিবরীজি ও পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম। নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের ৪৩৩ এসএসসি পরীক্ষার্থী ওই কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছিল। সীমান্তে গোলাগুলি ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে গত শনিবার থেকে ঘুমধুম কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীদের উখিয়ায় সরিয়ে আনা হয়।

উখিয়ার রাজাপালং ইউপির চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার কুতুপালং এলাকার বিপরীতে কচুবনিয়া সরকারি প্রাথমিক ও বড়বিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। সেখানে ঘুমধুম সীমান্ত থেকে ৩০০ পরিবার সরিয়ে আনা হচ্ছে। এরপর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার ঘুমধুম সীমান্ত পরিদর্শন করেন। সেখান থেকে যান ঘুমধুম পুলিশ ফাঁড়িতে। 

মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে পশ্চিমকুল গ্রামে গিয়ে কথা হয় স্থানীয় নবী হোসেন, আবদুল গফুর, ফারুক হোসেন কফিল উদ্দীনও শিক্ষক শারমীনের  সঙ্গে। তারা বলেন, গত দেড় মাস ধরে  শুরু হয়। থেমে থেমে ছোড়া হয় শতাধিক মর্টার শেল। গোলার বিকট শব্দে ঘরবাড়ি কাঁপতে থাকে। আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘন্টা বিরতি দিয়ে  আবার শুরু হয় গোলাগুলি। থেমে থেমে  মর্টার শেল ছোড়া হচ্ছে। বিকট শব্দে ঘরে থাকা যাচ্ছে না।

স্থানীয় নুরুল ইসলামের বাড়ি থেকে মিয়ানমারের কাঁটাতারের বেড়ার দূরত্ব প্রায় ৭০ গজ। কাঁটাতারের বেড়ার ৫০ গজের মধ্যেও বাংলাদেশিদের অনেকের ঘরবাড়ি দেখা গেছে। তার পাশে ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি ছৈয়দুল বশরের বাড়ি। তিনি বলেন, সবাই মিয়ানমারের গোলা আতঙ্কে ভুগছি। ভোররাত থেকে ওপারে গোলাগুলি চলছে। থেমে থেমে ছোড়া হচ্ছে মর্টার শেল। কাঁপছে এপারের ভূখণ্ড। দেড় মাস ধরে চলা মিয়ানমারের গোলাগুলিতে এলাকার হাজারো মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন বিপর্যস্ত। সীমান্ত এলাকার চাষাবাদ ও ক্ষেত খামার  প্রায় বন্ধ।

আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, ঘুমধুম সীমান্তের পাশে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ৭০-৮০টি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনার প্রস্তুতি চলছে। 

ঘুমধুম পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক (ইনচার্জ) সোহাগ রানা বলেন, সীমান্তে গোলাগুলি থেমে নেই। কিন্তু কারা গোলা গুলি করছে, গিয়ে সে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ নেই। সীমান্ত এলাকায় কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।

ওপারের একটি সূত্র জানিয়েছেন, আরকান আর্মি  ও মায়ানমার বাহিনীর মধ্যে তুমুল লড়াই চলছে। ইতিমধ্যে ৭/৮ টি মায়ানমার সীমান্ত রক্ষীর বিওপি ফাঁড়ি আরকান আর্মিরা দখলে নিয়েছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া ও ২ শতাধিক বিজিপি সদস্য এবং অর্ধশতাধিক আরকান বিদ্রোহী নিহত হয়েছেন। আরকান আর্মির অনেকের লাশ নাফ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে বিজিপি। ধারণা করা হচ্ছে নাফনদী থেকে উদ্ধার করা লাশ দুইটি ছিল আরকান আর্মির। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে টেকনাফ থেকে নাইক্ষ্যছড়ি সীমান্ত পর্যন্ত অতিরিক্ত বিজিবি ও কোস্ট গার্ড মোতায়েন করা হয়েছে। তারা রয়েছে সীমান্তে সতর্ক অবস্থায়। যে কারণে অপেক্ষমান হাজার হাজার রোহিঙ্গা এ পাড়ে অনু প্রবেশ করতে পারছে না।

জানা গেছে, বাংলাদেশের উখিয়া টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পেৃ রোহিঙ্গা রয়েছে প্রায় ১২ লাখ। আরো অন্তত ৬ লাখ রোহিঙ্গা মায়ানমারে অবস্থান করছেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বললেন, সুযোগ পেলে আরো ৬ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পড়বে। সীমান্তে আরো নিরাপত্তা জোরদার করা দরকার। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর মহড়া দেয়া যেতে পারে। যদিওবা এখনই সেনাবাহিনী  নিয়োগের পক্ষে নয় সরকার। 

তিনি আরো বলেন, সীমান্ত জনপদে বসবাসকারী মানুষেরা জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। সমস্যা সমাধানে সরকার কূটনীতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এতে সীমান্ত পাড়ের মানুষেরা খবই আশাবাদী যে, দ্রুত মায়ানমার কর্তৃক সৃষ্ট জটিলতার অবসান হবে। কিন্তু যখনই মায়ানমার রাষ্ট্রদূত কে একাধিক বার তলব করে ও কোন সাড়া পাওয়া যায় না। তখন খুবই হতাশ এবং উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেন সীমান্তের সাধারণ মানুষ।


   আরও সংবাদ