মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা হাজার বছরের প্রাচীন অমূল্য প্রত্নসম্পদ ও রঙিন পাথর বেচে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার উন্মাদনায় মেতেছে একটি চক্র। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান থেকে উদ্ধার করা প্রাচীন কষ্টিপাথরের মূর্তি এবং ভূগর্ভস্থ মূল্যবান রঙিন পাথর (যা স্থানীয়ভাবে ‘দানা’ নামে পরিচিত) সিন্ডিকেটের হাত ধরে চলে যাচ্ছে ঢাকা হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নওগাঁর পোরশা উপজেলার নিতপুরের টেকঠা এলাকায় পুনর্ভবা নদীর তীরবর্তী প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে বেপরোয়া মাটি খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, শেরশাহ ও সুজাউদ্দীন আমলের ঐতিহাসিক বাণিজ্যকেন্দ্র এবং প্রাচীন কালীমন্দিরকেন্দ্রিক জনপদ ছিল এই নদী অববাহিকা। শত শত বছর আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভূগর্ভে চাপা পড়ে বিপুল প্রত্নসম্পদ।
সম্প্রতি টেকঠা ভিটায় মাটি কাটতে গিয়ে প্রাচীন নিদর্শনের সন্ধান মিললে শুরু হয় অনিয়ন্ত্রিত খনন। কোদাল-শাবল হাতে স্থানীয় কিছু মানুষ চার-পাঁচ ফুট মাটি খুঁড়ে স্বর্ণমুদ্রা, রুপার অলঙ্কার, কষ্টিপাথরের দুর্লভ মূর্তি ও বিভিন্ন রঙের উজ্জ্বল পাথর সংগ্রহ করছে। সামান্য ১০ গ্রাম ওজনের বিশেষ পাথর মিললেই মিলছে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা। বিষ্ণুপুর গ্রামের মনিরুল ইসলাম জানান, সাত-আটজন মিলে তিন দিন মাটি খুঁড়ে পাওয়া একটি ‘দানা’ তারা ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন জামিরুল নামে এক ব্যবসায়ীর কাছে। নিতপুর এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য গামা জানান, প্রত্নসম্পদ রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় চক্রটি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
অনুসন্ধান বলছে, ‘দানা’ এবং ‘কষ্টিপাথরের মূর্তি’ সংগ্রহের পেছনে সক্রিয় দুটি আলাদা সিন্ডিকেট। নওগাঁর নিতপুরের নুরুল হুদার দুই ছেলে আমিরুল ও জামিরুল দানা পাচার চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছে। তারা কম দামে সংগৃহীত দানা সংগ্রহ করে পাচারের পথ সুগম করে। মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে আতাউর রহমান মিশু, মোসাদ্দেক ও আতাবুল। পরবর্তীতে এসব পাথর পৌঁছে দেওয়া হয় বগুড়ার নন্দীগ্রামের কীটনাশক ব্যবসায়ী সবুজের কাছে, যিনি ঢাকার মূল ক্রেতা ও বিদেশি বায়ারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করেন।
মহাস্থানগড় কেন্দ্রিক চক্র: বগুড়ার প্রাচীন মহাস্থানগড় এলাকা থেকে প্রত্ননিদর্শন ও মূর্তি তোলার কাজটি নিয়ন্ত্রণ করছে সুজন, ধলু, রফিক (বর্তমানে কারাবন্দী) এবং জহুরুল। তাদের সাথে যুক্ত সিংড়ার কালীগঞ্জের সাইদুর, থাওল গ্রামের মহসিন এবং শেরপুরের ফারুক, সুলতান ও গোপী ঘোষ। নাটোরের সিংড়ায় কষ্টিপাথর সংগ্রহের মূল ভূমিকা পালন করে মহসিন, তার ছেলে আবু সাঈদ, সাঈদুল এবং পাটুল এলাকার মামুন। এর সাথে যুক্ত সিরাজগঞ্জের মধ্যস্বত্বভোগী চক্র।
উত্তরবঙ্গ থেকে সংগৃহীত এসব অমূল্য কষ্টিপাথর ও দানা চলে যায় রাজধানীর গুলশান-২ এর ডিসিসি মার্কেটকেন্দ্রিক মাফিয়া জাকিরের হাতে। এই চক্রে সক্রিয় জাকিরের ছেলে সুমন, সিরাজের ছেলে সমসের ও মামুন, আবুল ও তার ফ্রান্সপ্রবাসী ছেলে জিতু, জলিলের মেয়ে নাসরিন এবং নান্নু। চক্রের সদস্য জাফর প্রত্নতাত্ত্বিক অপরাধে ভারতে জেল খাটলেও জামিনে বেরিয়ে আবার একই চক্রে যুক্ত হয়েছে; বর্তমানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে পুরনো কাঁসার দোকান খুলে বিদেশি ক্রেতাদের টার্গেট করছে সে। বিদেশি বায়াররা ঢাকার বারিধারার অভিজাত হোটেলে অবস্থান করে লেনদেন চূড়ান্ত করার পর এসব সম্পদ ব্যাংকক, বেইজিং কিংবা ভারতের জাবালপুর ও দিল্লির বাজারে আকাশপথে পাচার করা হয়।
এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া সমস্ত প্রত্ননিদর্শন রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নেওয়া হয়। আইন অনুযায়ী ভূগর্ভে পাওয়া যেকোনো ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের একমাত্র মালিক রাষ্ট্র। কোনো নাগরিক এসব ব্যক্তিগতভাবে কেনাবেচা, মজুত বা পাচার করলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।