তৈরি পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর মধ্যে প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দ করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর ১২৫টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে সংস্থাটি।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির কাজে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য এনবিআরের করসংক্রান্ত দুটি গোয়েন্দা ইউনিট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিয়েছে।
তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ীরা রয়েছেন।
এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কয়েকটি সরকারি সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংক হিসাব জব্দ ও লেনদেনের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পোশাক খাতে অস্থিরতা সৃষ্টিতে অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে। সেটির সত্যতা যাচাই করতেই তাঁদের লেনদেনের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে শ্রমিকদের কথা চিন্তা করে সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাব জব্দ না করে তথ্য তলব করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এনবিআরের আরেকটি সূত্র জানায়, ব্যাংক হিসাব জব্দ করার তালিকায় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বোনের স্বামী আলিফ মোল্লার নামও রয়েছে।
এনবিআরের তালিকায় তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের মন্ডল, গিভেন্সি, স্ট্যান্ডার্ড, নিপা, ওয়েল ও তুসুকাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সুতা, পোশাকের আনুষঙ্গিক পণ্য, প্যাকেজিং ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে বিস্তৃত।
এনবিআরের তালিকায় সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে মন্ডল গ্রুপের, ২৮টি। এর মধ্যে মন্ডল ইন্টিমেটস, কটন ফিল্ড, কটন ক্লাব, কটন ক্লোদিং, মন্ডল ফেব্রিকস, ট্রপিক্যাল নিটেক্স, মার্ক সোয়েটার, মন্ডল স্পিনিং মিলস, আলিম নিট, মন্ডল সিকিউরিটিজ, অ্যাপোলো ফ্যাশন, ট্রিমস ইন্টারন্যাশনাল, ইকো ইন্টিমেটস, অ্যাপোলো নিটওয়্যার, মন্ডল নিট কম্পোজিট ও মন্ডল ইয়ার্ন ডাইং উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া পানামা অ্যাগ্রো কমপ্লেক্স, জিগজ্যাগ স্টুডিও, মন্ডল অ্যান্ড কোম্পানি ও মনটেক্স ফেব্রিকসের নাম রয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে আছেন আবদুল আলিম মন্ডল, তারিন তাসলিমা, মো. জুবায়ের মন্ডল, সুলতানা খাতুন, মাসুদা খাতুন, আবদুল মান্নান মন্ডল, মোমেনা খাতুন ও আবদুল মোমিন মন্ডল।
এ ছাড়া গিভেন্সি গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান গিভেন্সি গার্মেন্টস, গিভেন্সি স্পিনিং মিলস, গিভেন্সি গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, গিভেন্সি ইয়ার্ন ডাইং ও গিভেন্স ফুডস অ্যান্ড এসেনশিয়ালস আছে তালিকায়। পাশাপাশি রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে আবদুল জাহিদ মুকুল, মাসুমা খাতুন, মাহমুদা খাতুন ও আবদুল হাদি প্রমুখের নাম।
স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ এবং দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স ও সাগর ইনফো বিল্ডার্সের যৌথ উদ্যোগের নামও রয়েছে তালিকায়। এ গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন এ কে এম মোশাররফ হোসেন, হোসনা আরা বেগম, মো. আতিউর রহমান, মাহমুদা বেগম, তাসমিয়া রহমান, হাসনাত মোশাররফ ও ফারিয়া রহমান।
নিপা গ্রুপের নিপা নিটওয়্যার কোম্পানি, সেলিনা অ্যাপারেলস ও নিপা ফ্যাশন ওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির নাম রয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে আছেন সাবেক সংসদ সদস্য মো. খসরু চৌধুরীসহ পরিবারের একাধিক সদস্য।
চট্টগ্রামভিত্তিক ওয়েল গ্রুপের ওয়েল অ্যাকসেসরিজ, ওয়েল ফ্যাশন ও ওয়েল ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানির নাম রয়েছে তালিকায়। ওয়েল গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামও রয়েছে তালিকায়। ওয়েল গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুচ সালাম আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন।
এ ছাড়া তুসুকা গ্রুপের নয়টি প্রতিষ্ঠান—তুসুকা প্যাকেজিং, তুসুকা স্টিচেস, তুসুকা অ্যাপারেলস, তুসুকা ফ্যাশনস, তুসুকা ওয়াশিং, তুসুকা প্রসেসিং, তুসুকা ডেনিম, তুসুকা জিনস ও তুসুকা ট্রাউজার্সের নাম রয়েছে তালিকায়। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন ব্যক্তির নামও রয়েছে তালিকায়।
তুসুকা গ্রুপের এক উদ্যোক্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, যে অভিযোগে ব্যাংক হিসাব জব্দ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা অবাস্তব। তিনি জানান, তাঁদের কারখানাগুলোয় ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এক দিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে এক থেকে দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়। নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো কাজে তাদের যুক্ত হওয়ার কারণ নেই।
এই উদ্যোক্তা আরও জানান, গ্রুপের চার উদ্যোক্তার একজন ফয়জুর রহমান সংসদ সদস্য ছিলেন এবং বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। অন্য তিন উদ্যোক্তা কখনো রাজনীতি করেননি। এ ধরনের উদ্যোগে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে।
তালিকায় বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম আবদুল মান্নান, তার পরিবারের সদস্য ফরিদা মান্নানসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে। আরও রয়েছে মিরপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও তার পরিবারের সদস্যরা। মিরপুর এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভে ইলিয়াস মোল্লার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এনবিআর সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তালিকায় থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পোশাক খাতের চলমান আন্দোলনকে উসকে দিতে নানাভাবে অর্থায়ন করা হয়েছে। সরকারের গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপরই এনবিআর দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য যাচাই করছে। এক সপ্তাহের মধ্যে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য এনবিআর পাঠাতে বলা হয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে।