ঢাকা, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩৩, ২৬ জ্বমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

ব্যাংক ধসে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট গৃহবন্দি



ব্যাংক ধসে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট গৃহবন্দি

ব্যাংক ধসের ঘটনায় সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ব্যাংকে গ্রাহকদের আমানত আটকে যাওয়ার পর ক্ষমতাচ্যুত প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনাকে গৃহবন্দি করা হয়েছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সরকারি ব্যাংকের পতনের ঘটনায় দায়িত্বে অসদাচরণের অভিযোগে সিনেট তাকে পদ থেকে অপসারণ করে। পরে তাকে গৃহবন্দি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন পেদ্রো আলিয়ানা। এদিন ৫২ বছর বয়সী আলিয়ানা দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির ৫৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এর আগে ২০২৩ সালে সান্তিয়াগো পেনার মেয়াদ শুরুর পর থেকে আলিয়ানা তার অধীনে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

বার্তা সংস্থা এপি বলছে, ওই ব্যাংক ধসের কারণে দেশটির ৬০ লাখ মানুষের প্রায় অর্ধেকই নিজেদের সঞ্চয় ব্যবহারের সুযোগ হারিয়েছেন। শুক্রবার উপস্থিত ৪৪ জন সিনেটরের সবাই পেনাকে অপসারণের পক্ষে ভোট দেন। ১৯৮৯ সালে জেনারেল আলফ্রেদো স্ত্রোসনারের ৩৫ বছরের স্বৈরশাসনের অবসানের পর অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া দ্বিতীয় প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট তিনি।

সিনেটের রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির অন্যতম স্থিতিশীল প্রেসিডেন্সির অবসান ঘটে। এ সময় কংগ্রেসের বাইরের চত্বরে জড়ো হওয়া মানুষের মধ্যে উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে। আমানতকারী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও জাতীয় ফুটবল দলের জার্সি পরা শিক্ষার্থীরা প্যারাগুয়ের পতাকা হাতে গান গাইতে থাকেন এবং একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। তাদের স্লোগান ছিল, ‘আর কখনো স্বৈরশাসন নয়!’

এর মাত্র তিনদিন আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো উয়েনো ব্যাংক জব্দ করে। এতে দেশটির আর্থিক ব্যবস্থায় ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে এবং এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটের সূচনা হয়।

পেনাকে রাজধানী আসুন্সিওনে তার একটি বাসায় অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শনিবার সকালে সরকারি কৌঁসুলিদের সামনে হাজির না হওয়া পর্যন্ত তাকে সেখানেই থাকতে হবে। তার বিরুদ্ধে আস্থার অপব্যবহার, প্রভাব খাটানো এবং ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য সরকারি পদ ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি উয়েনো ব্যাংকে সরকারি তহবিলের শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগের ব্যবস্থা করেছিলেন। এ সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যন্তরীণ ঋণ দেওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করে। তবে পেনা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

শুক্রবার রাতে তার বাসার চারপাশে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বাইরে জড়ো হওয়া লোকজন পতাকা হাতে সকাল পর্যন্ত অবস্থান করার অঙ্গীকার করেন, যাতে তিনি পালিয়ে যেতে না পারেন। সরকারি কৌঁসুলিরা কার্লোস কারভাল্লোকেও গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতেন, যা পরবর্তীতে ‘উয়েনো ব্যাংক’-এ রূপান্তরিত হয়। ২০২৩ সালে পেনা তাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। কারভাল্লোকে ইতিমধ্যে আটক করা হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

শুক্রবার ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। ২০২৮ সালের আগস্টে মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করবেন। রায় ঘোষণার আগে বিদায়ী বার্তায় পেনা জানান, তিনি চান না তার উপস্থিতি আরও বেশি বিভাজন বা অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে দাঁড়াক। তিনি লেখেন, ‘আমি কৃতজ্ঞতা নিয়ে বিদায় নিচ্ছি, তবে যারা আজ উত্তরের অপেক্ষায় আছেন, তাদের যন্ত্রণার কথা আমি উপেক্ষা করছি না।’

জনগণের ক্ষোভ দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। শুক্রবার সিনেটররা যখন এ বিষয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন বিক্ষোভকারীরা আসুন্সিওন শহরের কেন্দ্রে মিছিল বের করেন। তারা তাদের আটকে থাকা সঞ্চয় ফেরত এবং ‘উয়েনো’ ব্যাংকের ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহিতা দাবি করেন। এ সময় তারা স্লোগান দেন, ‘সান্তি পেনাকে টাকুম্বুতে পাঠাও!’ টাকুম্বু রাজধানীর প্রধান কারাগার, যেখানে উয়েনোর প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিগুয়েল ভাজকুয়েজ বর্তমানে আটক রয়েছেন।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ব্যাংকটি জব্দ করার পর উয়েনোর গ্রাহকেরা আর নগদ অর্থ তুলতে পারছিলেন না। নিজেদের সঞ্চয়ে প্রবেশাধিকার হারানোর পাশাপাশি কার্ড ব্যবহার করে কোনো কিছু কেনার সুযোগও বন্ধ হয়ে যায়। ডিজিটাল ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটি আকর্ষণীয় সুপারমার্কেট ছাড়ের প্রস্তাব দিয়ে দরিদ্র ও ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা মানুষের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। উয়েনোর তথ্য অনুযায়ী, এক মিলিয়নের বেশি প্যারাগুয়ের নাগরিক সেখানে তাদের জীবনের প্রথম ব্যাংক হিসাব খুলেছিলেন।

ব্যাংক ধসের প্রভাব শুধু আমানতকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। উয়েনোর ওপর নির্ভরশীল একটি যাত্রী পরিবহন অ্যাপ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে তিন হাজার চালক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি জানিয়েছে, জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য আন্তঃআমেরিকান উন্নয়ন ব্যাংক ও তাইওয়ানের কাছ থেকে নেওয়া ২ কোটি ১০ লাখ ডলারের ঋণও আটকে গেছে।

মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে অখ্যাত অবস্থা থেকে প্যারাগুয়ের আমানতের দিক দিয়ে অন্যতম বড় ব্যাংকে পরিণত হয়েছিল উয়েনো। সরকারি ৮০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রাখে। দেশটির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হিসাব ছিল ব্যাংকটিতে। জাতীয় ফুটবল স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে পথের বিক্রেতাদের ব্যাংক কার্ড—সব জায়গায় দেখা যেত প্রতিষ্ঠানটির চোখে পড়ার মতো লোগো।


   আরও সংবাদ