ঢাকা, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩৩, ২৫ জ্বমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

লামায় সাবেক হেডম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ



লামায় সাবেক হেডম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

বান্দরবানের লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের ৩০৩ নম্বর ডলুছড়ি মৌজার সাবেক হেডম্যান যোহন ত্রিপুরার বিরুদ্ধে হেডম্যান রিপোর্টের নামে অর্থ আদায়, রিপোর্টে কারচুপি এবং জমির মালিকানা পরিবর্তনে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্ব পালনকালে অর্থের বিনিময়ে হেডম্যান রিপোর্ট তৈরি করে এক ব্যক্তির জমি অন্য ব্যক্তির নামে দেখিয়ে বিক্রির সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি। এসব অভিযোগে জমি হারিয়ে বেশ কয়েকটি পাহাড়ি ও বাঙালি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৩০৩ নম্বর ডলুছড়ি মৌজার হেডম্যানের দায়িত্বে থাকাকালে যোহন ত্রিপুরা বিভিন্ন ভূমিসংক্রান্ত কাজে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে হেডম্যান রিপোর্ট তৈরি করে জমির প্রকৃত মালিকানা পরিবর্তনে সহযোগিতা করেছেন তিনি এবং এসব রিপোর্টের মাধ্যমে অন্যের জমি অন্য ব্যক্তির নামে দেখিয়ে বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে। এতে অনেক পরিবার তাদের বসতভিটা ও জমি হারিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানান তারা। এ ছাড়া দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের দাবি, এসব অনিয়মের কারণে মৌজার সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় ভূমিসেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক হেডম্যানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, হেডম্যান রিপোর্ট প্রদান ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বান্দরবান জেলা প্রশাসন তাকে হেডম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়। তবে এরপর থেকে ৩০৩ নম্বর ডলুছড়ি মৌজার হেডম্যান পদটি শূন্য রয়েছে বলে জানা যায়। নতুন হেডম্যান নিয়োগ না হওয়ায় জমির মালিকানা যাচাই ও হেডম্যান রিপোর্ট সংগ্রহসহ বিভিন্ন ভূমিসংক্রান্ত কাজে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

এ বিষয়ে সরই ইউনিয়নের কিয়াজু পাড়া বাজার এলাকার বাসিন্দা মিনহাজ বলেন, ১৯৮৪-৮৫ সালে পূর্ণচন্দ্র ত্রিপুরার কাছ থেকে তাঁর বাবা জায়গা নিয়েছিলেন এবং তৎকালীন বায়নানামা দলিলও তৈরি হয়েছিল। এরপর থেকে তারা দীর্ঘ বছর স্বপরিবারে সেখানে বসবাস করে আসছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে টাকার বিনিময়ে যোহন হেডম্যান পূর্ণচন্দ্র ত্রিপুরার স্থলে অন্য ব্যক্তিকে জায়গার মালিক সাজিয়ে হেডম্যান রিপোর্টের মাধ্যমে কোয়ান্টামের কাছে বিক্রি করে দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, তাদের জায়গা থেকে উচ্ছেদ করতে বিভিন্ন সময় মিথ্যা মামলাসহ হয়রানি করা হয় এবং তাঁর বাবাকে মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠিয়ে ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়। পরে তারা বাধ্য হয়ে সেখান থেকে অন্যত্র চলে যান। তিনি জানান, এসব অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে যোহন ত্রিপুরার হেডম্যান পদ বাতিল হলেও এখনো তাদের ক্রয়কৃত জায়গা ফিরে পাননি।

শুধু মিনহাজের পরিবার নয়, একই ইউনিয়নের টংগাঝিরি এলাকার আরেক বাসিন্দা হারমতি ত্রিপুরা বলেন, তাদের পিতাকে সহজ-সরল পেয়ে নিজস্ব জায়গা থেকে উচ্ছেদ করে জমি জোরপূর্বক দখল করে নেন যোহন হেডম্যান। তখন ভয়ে তারা মুখ খুলতে বা প্রতিবাদ করতে পারেননি। পরে তাদের জায়গা যোহন হেডম্যান বাইরের একটি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।

এদিকে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাবেক হেডম্যান যোহন ত্রিপুরা। তিনি অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন দাবি করেন। তিনি বলেন, মৌজার প্রজাদের স্বার্থ আদায়ে কাজ করতে গিয়ে একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। কেন তাকে হেডম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, অর্থ আত্মসাৎ ও হেডম্যান রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ তুলে তাকে হেডম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে প্রশাসন। তবে অভিযোগগুলো তদন্ত করে সঠিক তথ্য যাচাই করার কথা জানান তিনি।

অন্যদিকে সাবেক হেডম্যানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও অর্থের বিনিময়ে হেডম্যান রিপোর্ট প্রদানের অভিযোগের কারণে জেলা প্রশাসন তাকে অব্যাহতি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন মৌজার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত হেডম্যান দূর্জধন ত্রিপুরা। তিনি বলেন, তাঁকে হেডম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর তাকে ভারপ্রাপ্ত হেডম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তখন থেকে তিনি ৩০৩ নম্বর ডলুছড়ি মৌজার হেডম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার অভিযোগ, প্রশাসন থেকে ভারপ্রাপ্ত হেডম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হলেও বিভিন্ন সময়ে সাবেক হেডম্যান যোহন ত্রিপুরা কাগজপত্র তৈরি করে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ৩০৩ নম্বর ডলুছড়ি মৌজায় দ্রুত নতুন হেডম্যান নিয়োগের পাশাপাশি সাবেক হেডম্যান যোহন ত্রিপুরার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রতারণার মাধ্যমে জমি হারানো পরিবারগুলোর জমি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান এলাকাবাসী।


   আরও সংবাদ