ঢাকা, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ চৈত্র ১৪৩২, ১০ জ্বমাদিউল সানি ১৪৪৭
কতটা সুখে আছে প্রবাসী ---------- প্রর্ব-১

‘বাসি খাবারেই চলে প্রবাসীর জীবন’



‘বাসি খাবারেই চলে প্রবাসীর জীবন’

আকিব ইমরান

প্রতি বছর বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন হাজার হাজার বাংলাদেশী নাগরিক। তাদের লক্ষ্য জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি। বিভিন্ন দেশে কর্মরত এসব প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, স্কুল, মাদরাসা, মসজিদ, হাসপাতাল স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও এ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের বৈদেশিক রিজার্ভ সমৃদ্ধ করছেন। দারিদ্র্যবিমোচন ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

একজন প্রবাসী মানেই একজন যোদ্ধা। যারা প্রতিনিয়তই নিজের সাথে যুদ্ধ করেন পরিবারের ও দেশের জন্য। যাদের হাত ধরেই দাঁড়িয়ে আছে অর্থনীতির বড় একটা অংশ। তাদের পাঠানো আয়ের টাকায় চলে লাখ লাখ পরিবার। শক্তি পায় সোনার বাংলাদেশ। গত দুই বছর ধরে যখন বিশ্বব্যাপী হানা দেয় মহামারী করোনা, থমকে যায় দেশের অর্থনীতির চাকা। ঠিক তখনো দেশের হাল ধরেছেন এই রেমিট্যান্স যোদ্ধারাই। নিজেরা খেয়ে না খেয়ে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ। যার হাত ধরে এই মহামারীতেও পথ হারায়নি দেশ। বরং মহামারীরর শেষ সময়ে খুব ভালভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। যারা দেশের জন্য এ অসামান্য অবদান রেখেছেন তাদের প্রবাস জীবন কতটা সুখের তা অনেকেরই অজানা। প্রবাসীদের জীনযাত্রা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব থাকছে আজ। বিশেষ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন আমাদের প্রবাস প্রতিনিধি আকিব ইমরান।

বাসি খাবার খেয়েই কাটিয়ে দিয়েছি প্রবাস জীবনের পাঁচ বছর। এখনো বাসি খাবারেই চলে জীবন। সারাদিন ডিউটি করে এসে আবার রান্না করাটা খুব বেশি কষ্টের। তাই একসাথেই চার-পাঁচদিনের রান্না করে রাখি। ডিউটি শেষ করে এসে গরম করে সে খাবারই খাই। কথাগুলো বলছিলেন, সৌদি প্রবাসী লক্ষ্মীপুরের মো. মামুন। এই প্রবাসী দেশখবরকে বলেন, প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় কষ্ট হচ্ছে নিয়ম করে খাওয়া দাওয়া করা। সারাদিন কাজ করে এসে আবার নিজের রান্না নিজেই করা লাগে। পেটে খুদা রেখে রান্না করতে কি যে কষ্ট তা শুধু আমাদের মতো প্রবাসীরাই জানে। এজন্য বেশিরভাগ সময়ই একসাথে চার-পাঁচ দিনের রান্না একসাথে করে রাখি। এই বাসি খাবার খেয়েই প্রাবাসে চার বছর কাটিয়ে দিয়েছি। খোঁজ নিয়ে দেখেন প্রায় সব প্রবাসীরই একই অবস্থা।

কেনো প্রবাসে এলেন জানতে চাইলে মামুন বলেন, দেশে কাজের কোন সুযোগ পাইনি। পরিারের সুখের জন্য পাড়ি দিয়েছি বিদেশে। ভেবেছি ভালো কিছু করবো। তবে তা আর হয়ে উঠেনি। সারাদিন কাজ করে সবমিলিয়ে টাকা পাই ১৫০০ রিয়েল। যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩৪ হাজার টাকা। এই বেতনে তো আর পরিবারের চাহিদা মেটানো যায় না। এখানে ফকিরের মতো জীবনযাপন করলেও একজন মানুষের মাসে ৭০০ থেকে ৯০০ রিয়েল প্রয়োজন। এখন দেশে গিয়ে কি করবো? সঞ্চয় বলতে তো কিছুই নেই। তারওপর দেশে জিনিষপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে, দেশে গিয়েও তো কিছু করতে পারবো না। এসব কথা চিন্তা করেই কোনমতে চালিয়ে নিচ্ছি আরকি।

প্রবাসী রুবেল দেশখবরকে দেশের প্রতি তার ভালোবাসা আর আবেগের কথা জানিয়ে বলেন, প্রবাসে থাকা একজন মানুষের সবচেয়ে বড় যে টান, তা হলো নাড়ির টান। যে মানুষগুলো দেশে থাকে তারা সাধারণত নাড়ির টানটা অনুভব করতে পারে না। কেন না তারা দেশ দেখতে পাচ্ছে, দেশের মানুষ দেখতে পাচ্ছে, আরো দেখতে পাচ্ছে মাকে। ইচ্ছে করলেই ক্লান্তি এলেই তারা মায়ের আঁচল পেতে জীবনের সব ক্লান্তি দূর করতে পারছে নিমিষেই। প্রবাসে অপরিচিত একজন লোক বাংলা ভাষায় কথা বললেই তাকে অনেক বেশি আপন মনে হয়। ইচ্ছে করে তাকে জড়িয়ে ধরে সব ভালোবাসা উজাড় করে দেই। বুকে জমানো সব কষ্ট তার কাছেই বলি। তিনি বলেন, একটা পন্যের গায়ে যখন মেইড ইন বাংলাদেশ লেখা দেখি তখন কি যে অনুভুতি হয় বলে বোঝানো যাবে না। তখন গর্বে বুকটা ফুলে উঠে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আরব আমিরাত প্রবাসী অভিযোগ করে বলেন, নিজের সব স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছি এই ভেবেই শান্তনা পাচ্ছি। তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাই তখন যখন দেখি কোন সরকারই আমাদেরকে যথাযোগ্য সম্যান দিচ্ছে না। বিদেশের বিমানবন্দরে আমাদের সাথে যে আচরণ করা হয় তাতে নিজেদের কাছে মনে হয় আমরা পৃথিবীর সেরা মানুষ। আবার যখন দেশের বিমানবন্দরে যাই তখন যেমন আচরণের শিকার হই তাতে মনে হয় আমরা যেন গলির কুকুর। নিজের দেশ আমাদের মূল্য দেয় না অথচ আমাদের জন্যই আজ দেশের মানুষ ভালো আছে।


   আরও সংবাদ