শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ইন্ডিয়া! বাইতুল মোকাররমের খতিবের ন্যয় পলাতক গভর্নর রউফ তালুকদার। এক ডজনের বেশি ব্যাংকে একযোগে ‘মব’, ব্যাংকগুলোর সাবেক চেয়ারম্যান-ডিরেক্টরদের পলায়ন, বিদেশি ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট লাইন সংকোচন, তীব্র ডলার সংকট- রিজার্ভ ভয়াবহ পতনের মুখে, আমদানি জাহাজ ছাড়ার আগেই অগ্রিম পেমেন্টের চাপ এর সঙ্গে যোগ হয় বিদেশি ব্যাংকের কাছে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের ওভারডিউ। এমন অস্থির সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন বিদায়ী বিবি গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
দায়িত্ব নিয়েই প্রায় দেড় ডজন ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন করতে হয়। অভিযোগ ছিল, শেখ হাসিনা-র সরকার এবং আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মাধ্যমে কিছু ব্যাংক কার্যত রাজনৈতিক বিবেচনায় বিতরণ করা হয়েছিল।
দ্রুত নতুন বোর্ড গঠন, বাজারের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের খুঁজে এনে বসানো এবং আস্থাহীন একটি খাতকে স্থিতিশীল করার কাজ ছিল অত্যন্ত কঠিন। এই প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেন—গভর্নর নীতিনির্দেশনা দিয়েছেন, আর বাস্তবায়ন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভিজ্ঞ ও পরিশ্রমী টিম। বিদায় বেলায় রেখে গেছেন, সাত মাসের আমদানি বিল পরিশোধ করার মতো (৩৫ বিলিয়ন) রিজার্ভ, ডলার বাজার রেট স্থিতিশিল, প্রায় শিংহভাগ ওভারডিউ পেমেন্ট পরিশোধ, ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। তিনি এমনটা করতে পেরেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চৌকশ কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই। বের করে নিয়ে এসেছেন লুকিয়ে রাখা কার্পেটের নিচ থেকে সাড়ে ৪.৫ লাখ নতুন খেলাপি ঋণ!
বেক্সিমকো ও এস আলমের ঋণ কাহিনি: ফাইলের ভেতরের বিস্ফোরণ
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা এস.আলম। এস আলম-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক খাত থেকে দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ বের করে নিয়েছে। এই ঋণ সরাসরি একক প্রতিষ্ঠানের নামে নয়—বরং সহযোগী, সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সহযোগী, এবং বিভিন্ন স্তরের সাবসিডিয়ারি ও শেল কোম্পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে। এই বিপুল ঋণ বিতরণ সম্ভব হয়েছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রভাবের কারণে। এই তথ্যগুলো আহসান এইচ মনসুরের নির্দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বের করে নিয়ে আসেন।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে আরেক আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল সালমান এফ রহমান-নিয়ন্ত্রিত বেক্সিমকো গ্রুপ-এর ঋণ কাঠামো। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অস্তিত্বহীন বা দুর্বল প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়—যার অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা। শুধু জনতা ব্যাংক থেকেই ২৫টি প্রতিষ্ঠানের নামেই ২৩ হাজার কোটির বেশি। আইএফআইসি ব্যাংক-সহ আরও কয়েকটি ব্যাংক থেকেও বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়। এর বড় অংশই খেলাপিতে পরিণত হয়। এই তথ্যগুলো রাতারাতি বেরিয়ে আসেনি। প্রভাবশালী একটি গ্রুপের ঋণ ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে নেওয়াই যেখানে একসময় ছিল ‘কম্পনের’ মতো ঘটনা—সেখানে পুরো এক্সপোজার তুলে আনা ছিল কঠিন প্রশাসনিক লড়াই। এই কাজটি করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা—ডেটা রিকনসিলিয়েশন, ক্রস-ভেরিফিকেশন, সিকিউরিটি যাচাই, গ্রুপ এক্সপোজার বিশ্লেষণ—সবকিছু ধাপে ধাপে। গভর্নর নির্দেশক ছিলেন, কিন্তু খননকারীরা ছিলেন কর্মকর্তারা।
পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এস আলম-নিয়ন্ত্রিত চারটি ইসলামী ব্যাংক এবং নজরুল ইসলাম মজুমদার-নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যাংকের অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ করার সিদ্ধান্ত হয়। আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে নিয়োগ দেওয়া হয় Ernst & Young ও KPMG-এর মতো প্রতিষ্ঠানকে। এই ব্যাংকগুলো একীভূত করে এখন তৈরি করা হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কাঠামো। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই একটি কথা শোনা যায়—ভালো দুটি ব্যাংককেও নাকি অকারণে একীভূত করে ফেলা হয়েছে। যারা এমন দাবি করেন, তাদের জন্য কিছু উদাহরণই যথেষ্ট। ধরা যাক এক্সিম ব্যাংক-এর কথা। ২০২৪ সালের জুনে, শেখ হাসিনা-র আমলে, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছিল মাত্র ১,৮৬৬ কোটি টাকা—মোট ঋণের ৩.৬ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, এত কম খেলাপি থাকা সত্ত্বেও এই ব্যাংকটিকেও কেন ছাড় দেওয়া হলো না?
কিন্তু কোয়ালিটি রিভিউয়ের পরের চিত্র কী ছিল? শেখ হাসিনার বিদায়ের তিন মাসের মাথায়, সেপ্টেম্বরের পর্যালোচনায় দেখা যায়—ব্যাংকের কার্পেট উল্টে বাস্তব হিসাব সামনে এলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ২৫,১০০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৫০ শতাংশ। তাহলে ‘ভালো’ বলে পরিচিত ব্যাংকটির প্রকৃত অবস্থান কোথায় ছিল—তা নতুন করে ভাবতে হয়।
আরেকটি উদাহরণ সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ১,৭৮৮ কোটি টাকা—মোট ঋণের ৪.৭৭ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ৫ শতাংশের নিচে খেলাপি থাকলে সেটিকে সহনীয় ধরা হয়—এমন যুক্তিও কেউ কেউ দিয়েছেন। তাহলে প্রশ্ন জাগতেই পারে—এই ব্যাংকটিকে কেন ‘ধ্বংসের মুখে’ ঠেলে দেওয়া হলো? কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা শেষে দেখা যায়, প্রকৃত খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৩,৫৭৫ কোটি টাকা—মোট ঋণের প্রায় ৬২ শতাংশ। এখন ৬২ শতাংশ খেলাপি নিয়ে একটি ব্যাংককে কি সুস্থ বলা যায়?
বাকিগুলোর হিসাবও কম ভয়াবহ নয়। ইউনিয়ন ব্যাংক: খেলাপি ঋণ প্রায় ৯৭.৮০%, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক: প্রায় ৯৫%, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক: প্রায় ৯৬.৩৭% সবগুলোই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে নিরীক্ষা-পরবর্তী হিসাব। এখন কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন—এস আলম-সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোই শুধু চোখে পড়ল, দুর্বল পদ্মা, এবি বা ন্যাশনাল ব্যাংক কি চোখে পড়েনি? বাস্তবতা হলো, ইসলামী ব্যাংকগুলোর ভেতরে প্রচলিত ধারার ব্যাংক যুক্ত করে একীভূতকরণ করলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যেত। তখন পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারত। একীভূত করার পর অন্তত একটি কাঠামোগত সমাধান সামনে আনা হয়েছে। ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স স্কিমের আওতায় ব্যক্তি পর্যায়ের আমানতকারীদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত প্রদান করা হয়েছে। বাকি অর্থ পরিশোধের জন্য একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকার থেকেও বড় অঙ্কের তহবিল জোগাড় করা হয়েছে। তবুও সমালোচকদের অভিযোগ—ব্যাংক ‘শেষ’ করে দেওয়া হয়েছে।
পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা যেতে পারে—কেন বসুন্ধরাসহ দেশের শীর্ষ বিশটি শিল্পগোষ্ঠী আহসান এইচ মনসুরের প্রতি অসন্তুষ্ট। কারণ, অনিয়মের পর্দা সরালে অনেকের অস্বস্তি তৈরি হয়। আর তৃতীয় পর্বে আসতে পারে ডলার বাজার ও রিজার্ভ—কোথা থেকে কোথায় নেওয়া হয়েছিল, কীভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন—এই পুরো সংগ্রামে সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর একা ছিলেন না। তার সবচেয়ে বড় শক্তি ও ঢাল ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তাদের নিরলস পরিশ্রম, তথ্য-উন্মোচন, নিরীক্ষা সমন্বয় এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণ ছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো না। হ্যাঁ, তার একটি সীমাবদ্ধতাও ছিল—খোলামেলা কথা বলতে গিয়ে তিনি কখনও কখনও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু দুর্বল দিক বা কর্মকর্তাদের সমালোচনা করেছেন। এতে পরিশ্রমী ও মেধাবী অনেক কর্মকর্তার মনোকষ্ট তৈরি হয়েছে, যার কারণে তার বিদায়ে বড় একটি অংশ কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন।
তবুও প্রশ্নটি থেকে যায়—তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংক খাত কোন অবস্থায় ছিল, আর তার সময়কালে কোথায় এসে দাঁড়ায়? অনেকে সমালোচনায় ব্যস্ত থাকলেও, বাস্তব চিত্রের একটি অংশ হলো—গোপন ঝুঁকি প্রকাশ্যে আনা হয়েছে, প্রকৃত হিসাব সামনে এসেছে, এবং সমস্যাকে চাপা না দিয়ে কাঠামোগত সমাধানের পথে হাঁটার চেষ্টা হয়েছে।
লিখেছেন: অর্থনৈতিক বিষয়ক সাংবাদিক শাখাওয়াত প্রিন্স