ঢাকা, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩২, ১৫ রমজান ১৪৪৭

খামেনির স্বেচ্ছা শহীদানের চাইতে বড় অস্ত্র মানুষের নাই আজ 



খামেনির স্বেচ্ছা শহীদানের চাইতে বড় অস্ত্র মানুষের নাই আজ 

ভাইকিংস মুভি সিরিজে র‍্যাগনার লর্থব্রোকের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের শেষ অ্যাকশন ছিল ইংল্যান্ডের রাজার কাছে ধরা দেওয়া এবং অজস্র বিষাক্ত সাপের কাপড়ে নৃশংস মৃত্যু বরণ করা। এটাই ছিল তার শেষ অ্যাকশন। এই অ্যাকশন ডেকে এনেছিল ভয়ংকর প্রতিশোধ। তাকে ভুল বোঝা নর্থম্যান ভাইকিং জাতিরা, গৃহযুদ্ধে লিপ্ত তার সন্তানেরা তাদের আদিপিতা র‍্যাগনারের মৃত্যুর প্রতিশোধে এক হয়। ভাইকিংদের সবচেয়ে বড় ঐক্য হয়, ভীষণ প্রতিশোধে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে ইংল্যান্ডে। 

ঠিক এই কাজটাই করেছেন ইরানের শহীদ নেতা সৈয়দ আলী খামেনি। তিনিও নবীর বংশধর হাসান-হুসেনের মতো জহরে-কহরে শহীদ হয়েছেন। তাঁর সেনানায়কেরা গুপ্তহত্যার শিকার হচ্ছেন, তাঁর জাতি আগ্রাসনে বিলীন হবার মুখে। ইরান বিপ্লবের ভাল-মন্দে মেশানো ৪৭ বছরের সাধনা, ৭৩ বছরের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই সব দজ্জালদের সামনে শেষ হতে পারে না। 

তাই তিনি কারবালার পথ নিলেন। পালালেন না। ইয়াজিদের হাতে, রাজতান্ত্রিক আরব উমাইয়াদের হাতে, তাদের নাফরমান বন্ধুদের হাতে শহীদ হলেন সপরিবারে। কারবালা অপশন বেছে নিলেন খামেনি, জন্ম হলো নতুন বিষাদসিন্ধুর। বিষাদের এই সিন্ধু, আবের এই অশ্রু এখন নরকের আগুন হয়ে ঝরছে জগতের ঘৃণিত আরব-ইসরায়েলি-শ্বেতরোগী পশ্চিমা সভ্যতার উপর। 

চেগুয়েভারার শহীদান ছিল সুদূরপ্রসারী। যিশুর আত্মদান থেকে একটা মজলুম ধর্মের জন্ম হয়েছিল। আর কারবালা থেকে জন্মেছিল ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহিমার। সব জয় জয় নয়, কিন্তু কিছু কিছু মরণে অভীষ্ঠ অর্জন হয়। কুরুক্ষেত্রে ছলনাময় জয় পেয়েছিলেন অর্জুন, কিন্তু আমাদের মন ভেজায় কর্ণের বীরত্বময় আত্মত্যাগ। 

আলী খামেনি মরে গিয়ে বেঁচে গেলেন। তিনি বলছিলেন, আমার এই বৃদ্ধ জীবনের কী মূল্য,  এমনকি ইরানেরই বা কী মূল্য। ইসলাম না বাঁচলে আমার বাঁচা কী,  ইরান রাষ্ট্র কী। ইসলাম যে জুলুমের বিরুদ্ধে শহীদান, সেই অতিমানবীয় উদাহরণ তিনি রেখে গেলেন। ইসরায়েলি গুপ্ত হত্যা ঠেকাতে না পেরে, তাদের পরাজিত করতে নিজেই প্রকাশ্যে হত্যা হলেন। ফলে আর গুপ্ত বলে কিছু রইলো না। গোটা দুনিয়া জানলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা, শিয়াদের দ্বিতীয় পবিত্র পুরুষ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের সফলতম রূপকার নিজেই শহীদ হলেন। এ এই এআই-এপস্টাইন বিকৃতির যুগে এক আশ্চর্য উপকথা। এক মুমিনের মাজেজা। 

তাঁর হত্যায় শুধু সামরিক ময়দানে না, সামাজিক ময়দানে পাকিস্তান থেকে কাশ্মীর, আফগান থেকে আজারবাইজান, ইরাক থেকে বাহরাইনসহ সারা বিশ্বের শিয়া জনতার মধ্যে যে বিদ্রোহী বিদ্যুত্‌ সংযোগ হয়ে গেল, এর ধাক্কা চলবে আগামীকয়েক দশক৤ মুসলমান হওয়ার মানে কী, তা জানবে সুন্নীরাও। এখান থেকে জন্ম নিচ্ছে এক প্রতিরোধ, ইসলাম এখান থেকে পুনর্জীবিত হচ্ছে তার শহীদি জালেমবিরোধী সংগ্রামে। এর ঢেউ সমগ্র মুসলিম জগতকে কাঁদাচ্ছে, আলোড়িত করছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ থেকে প্রেরণা নেবে। নিশ্চয়ই আপসী জীবিতের চাইতে পবিত্র মৃত্যুর শক্তি অধিক। এই প্রতিরোধের থিওলজি থেকেই শক্তি টেপেয়েছিল ইসলাম। আদর্শহীন সৈনিক ভাড়াটে যন্ত্র বা সালাফী জঙ্গী। আলী খামেনির শহীদান ইসলামের ভেতর রাজতন্ত্র আর তার পোষা জঙ্গীদের যুগের ইতি ঘটাবে। খামেনিকে তাঁর পরিবার একা ছাড়তে চায়নি। মাত্র একজন উত্তরাধিকারকে বাইরে রেখে সপরিবারে তাঁরা মৃত্যুর দরজায় অপেক্ষা করেছেন। 

এপস্টাইনের শিশুমাংসভোগী সভ্যতা, শিশু হত্যাকারী পুঁজিবাদ অনেক আধুনিক, কিন্তু সেই আধুনিকতাকে একটা ফুত্‌কারে উড়িয়ে দিয়ে আবার মানবের মহাগাথা জন্ম দিলেন খামেনী। তাঁর সমস্ত রাষ্ট্রনৈতিক ভুলের প্রায়শ্চিত্তও করলেন হয়তো। আপনাকে অভিবাদন, অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্সের জয় হোক।

লিখেছেন: পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ


   আরও সংবাদ